Top News

যুদ্ধে ইরানের নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র কি ফাঁদে পড়ল

 

যুদ্ধে ইরানের নতুন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র কি ফাঁদে পড়ল




হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুমে’ বসে ইরানে হামলা পর্যবেক্ষণে ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: হোয়াইট হাউস

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আনা। কাগজে-কলমে এই লক্ষ্য হয়তো এখনো আছে। তবে ওয়াশিংটন থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগের অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে এসে তাদের এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে।

মাঠের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, এই অভিযান ইরানের শাসনব্যবস্থায় ধস নামানোর জন্য যে ধরনের জনরোষ বা অস্থিরতা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। উল্টো চার দিনের মাথায় যুদ্ধ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়ার বদলে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও বেশ স্থিতিশীলই আছে। শুধু তা–ই নয়, শত্রুপক্ষের বিভিন্ন অবস্থানে পাল্টা আঘাতও হেনে যাচ্ছে দেশটি।

এই পরিস্থিতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আগের হিসাব নতুন করে মেলাতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং তেহরানের আলোচনার প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের আগের সব অনুমান এখন প্রশ্নের মুখে। আর সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানও আলোচনার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না।

এদিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতায় একদমই সাড়া দিচ্ছে না ইরান। পাশাপাশি যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা আছে, তাদেরও প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে দেশটি। বিষয়টি নিছক জেদ বা আদর্শিক অনমনীয়তা নয়, এটি তেহরানের একটি সুচিন্তিত রণকৌশলেরই প্রতিফলন। তেহরান মনে করছে, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো সমঝোতা বা যুদ্ধবিরতি শত্রুপক্ষকে ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার সুযোগ করে দেবে।

দুটি বাস্তবমুখী পরিস্থিতি এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। প্রথমত, খোদ মার্কিন প্রশাসনই স্বীকার করেছে যে এই যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী বা সীমিত না-ও হতে পারে। পেন্টাগনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, ‘অতিরিক্ত প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।’

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য শঙ্কা দূর করার চেষ্টা করে বলেছেন, ‘এটি ইরাক নয়, এটি অন্তহীন কোনো যুদ্ধও নয়।’ তবে একটি ‘অন্তহীন’ পরিস্থিতির সম্ভাবনা অস্বীকার করার এ প্রবণতাই প্রমাণ করে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিষয়টি এখন জন-আলোচনার অংশে পরিণত হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কণ্ঠেও একই সুর। এই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সেই যৌথ প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে, যার মাধ্যমে তারা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রশমিত করতে চায়। কারণ, তাদের অভিযানের প্রাথমিক সেই ‘শক অ্যান্ড অউ’ (আকস্মিক ও প্রচণ্ড আঘাত) পর্যায়টি প্রত্যাশিত কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি।

তা ছাড়া ইসরায়েল যে ইরানে হামলা চালাবে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান যে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চড়াও হবে’—মার্কিন প্রশাসন তা আগে থেকেই জানত বলে স্বীকার করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এই স্বীকারোক্তির পর তিনি অভিযানের পরিধি কমানোর বদলে বরং এর লক্ষ্য আরও বিস্তৃত করেছেন। রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে চায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে এবং সেই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে যতটুকু সময় প্রয়োজন, আমরা ঠিক ততটুকুই করব।’

     

ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল 

ইরানের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তেহরান সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরাসরি সমর্থন থাকায় কেবল ইসরায়েলের ওপর ক্ষয়ক্ষতি চালিয়ে কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফাটল ধরানো সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে, তারা এখন এমন এক কৌশল বেছে নিয়েছে, যার লক্ষ্য হলো পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া।

তবে এই রণকৌশল তেহরানের জন্যও বেশ কিছু বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। খবর পাওয়া গেছে, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ করছেন। দেশটির একজন সামরিক কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে অকপটে বলেন, ‘হামলার প্রথম ধাক্কার পর নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আঞ্চলিক সামরিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মূল কেন্দ্রের সংযোগ তখন ভেঙে পড়েছিল।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আগে থেকে ব্রিফিং পাওয়া ইউনিটগুলো নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে কাজ শুরু করেছিল। দ্বিতীয় দিন সকালের মধ্যে আবার সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় এবং আমরা তার ফল পেতে শুরু করি। তবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে এখনো বেশ কিছু গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।’

আরও পড়ুন 

ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ‘বহুস্তরীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের যে সক্ষমতা রয়েছে, তাতে এই অঞ্চলে কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমরা আমাদের নেতাকে হারিয়ে সবচেয়ে বড় মূল্যটি চুকিয়েছি; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের মূল্য দিতে হবে আরও অনেক বেশি। তাদের লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট। তবে তারা যে সামরিক সম্পদগুলোকে অবজ্ঞা করেছিল বা খেয়াল করেনি, সেগুলো দিয়েই আমরা অন্তত আরও দুই মাস এই মাত্রার প্রতিরোধ বজায় রাখতে পারব। আমাদের মজুত এবং পরিকল্পনা এখনো অটুট।’

প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করে। যদিও ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর বাগাড়ম্বর একেবারে উবে যায়নি, তবে এর ওপর আগের সেই জোর এখন অনেকটাই স্তিমিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অবস্থান এবং বিশ্বজুড়ে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে।



Post a Comment

Previous Post Next Post